ফকিরহাট উপজেলা ভূমি অফিসে দুর্নীতির জালে জর্জরিত সাধারণ মানুষ
মোঃ জুয়েল খাঁন, খুলনা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান
বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলা ভূমি অফিসে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় সাধারণ মানুষ আজ চরম ভোগান্তির শিকার। অভিযোগ উঠেছে— ঘুষ ও দালালচক্রের প্রভাবে একই জমির উপর একাধিক মিউটেশন (খতিয়ান) তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, যা ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে চরম অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি উপজেলার পাগলা দিয়াপাড়া ৩৮ নং মৌজার। জানা গেছে, সমবায় ব্যাংক বাগেরহাট থেকে নিলামের মাধ্যমে স্বপন কুমার মণ্ডল নামের এক ব্যক্তি ২০১৬ সালের ১১ জুলাই ১ একর ৪০ শতক জমি ক্রয় করেন। ব্যাংকের নিলাম দলিল অনুযায়ী তিনি জমিটির বৈধ মালিক হন।
তবে স্বপন কুমার মণ্ডল ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার জমি সংক্রান্ত কোনো নথি হাতে পায়নি। এ সুযোগে তাঁর স্ত্রীর আত্মীয় বিশ্বজিৎ মণ্ডল নামের এক দালাল ২০২১ সাল থেকে জমিটি নিজের নামে নেয়ার জন্য নানা প্রক্রিয়া শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টা শেষে তিনি আবেদন নং ৫৯৮৭৭৪১, তারিখ ১৯ জুন ২০২৪, এবং মিউটেশন মামলা নং ৭.৪৯৯ (২০২৩–২৪) এর মাধ্যমে উক্ত জমি নিজের নামে মিউটেশন করতে সক্ষম হন।
কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একই জমির উপর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল আবারও আরেকটি মিউটেশন করা হয়। এইবার আবেদন নং ৭১০৮৫৩৬, মামলা নং ৫২১৬/২০২০–২৫, অনলাইন ডিসিআর নং DCR25013403805216— যার মাধ্যমে পূর্বের মালিকপক্ষের উত্তরাধিকারীরা আরেকবার মিউটেশন সম্পন্ন করেন।
অর্থাৎ, একই দাগ ও খতিয়ানের জমির উপর দুটি পৃথক মিউটেশন সম্পন্ন হয়েছে— যা আইনগতভাবে একেবারেই অসম্ভব। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি কোনো ভুল নয়, বরং ঘুষ ও প্রভাবের বিনিময়ে সচেতনভাবে করা হয়েছে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একই সম্পত্তির দুইটি মিউটেশন দেওয়া মানে আইনকে উপহাস করা। সাধারণ মানুষ সামান্য ভুল করলেই প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু কর্মকর্তাদের এমন জঘন্য অনিয়মে কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না।”
সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফকিরহাট ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও দালাল চক্র মিলে জাল কাগজপত্র তৈরি করে অন্যের জমিও নিজেদের নামে মিউটেশন করে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মন্তব্য করেন,
“একই জমির দুইটি মিউটেশন কখনোই হতে পারে না। যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে এটি ইচ্ছাকৃত অনিয়ম। ৫০ ধারা প্রয়োগ করে এই মিউটেশন বাতিল করা সম্ভব, তবে প্রশ্ন হলো— কর্মকর্তারা কাগজপত্র না দেখে কীভাবে অনুমোদন দিলেন? নাকি ঘুষের কারণে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন?”
ভুক্তভোগীদের দাবী— এই সকল অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জমি হরণ করতে না পারে।
এলাকাবাসীর এক প্রবীণ নাগরিক বলেন,
“ভূমি অফিসে আজ দালালের দৌরাত্ম্য চরমে। ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না। এভাবে চলতে থাকলে আইনের শাসন শুধু কাগজেই থাকবে, বাস্তবে নয়।”
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—
“একই দাগের জমির দুইটি মিউটেশন কীভাবে সম্ভব?”
এর জবাব কেউ দিতে না পারলেও, দুর্নীতির এই দৃষ্টান্ত স্থানীয় প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।