বিষাক্ত বর্জ্যে ফুলজোর নদীতে ভয়াবহ দূষণ মাছ মরে ভেসে উঠছে, জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে
মোঃ সিমান্ত তালুকদার
রায়গঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ফুলজোর নদী শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক দূষণের ফলে মাছসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠছে। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর উজানে বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার ছোনকা এলাকায় গড়ে ওঠা কয়েকটি শিল্পকারখানা থেকে নিয়মিতভাবে রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি ফুলজোর নদীতে ফেলা হচ্ছে। স্রোতের সঙ্গে সেই দূষিত পানি ভাটিতে এসে রায়গঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় নদীর পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে নদীর পানির রঙ পরিবর্তন হয়ে কালচে হয়ে গেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এর পর থেকেই মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ব্যাপকহারে মারা যেতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে নদীতে মৃত মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও শামুক ভেসে উঠছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
রায়গঞ্জ উপজেলার শতাধিক মৎস্যচাষি ফুলজোর নদীতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু হঠাৎ নদীর পানিতে বিষাক্ত বর্জ্য মিশে যাওয়ায় উন্মুক্ত মাছের পাশাপাশি খাঁচায় চাষ করা মাছও মারা যাচ্ছে। এতে চাষিরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায় মাছ না পেয়ে চরম সংকটে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, কয়েকদিন ধরে নদীর পানিতে অস্বাভাবিক রঙ ও দুর্গন্ধ দেখা দেওয়ার পর থেকেই মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। ফলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দূষণের ফলে নদীর পানি কৃষিকাজ, গোসল ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পানিতে নামলে মানুষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল গত শনিবার ফুলজোর নদীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে। এ সময় স্থানীয়রা মাছচাষ, কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনে ব্যাপক ক্ষতির কথা তুলে ধরেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পরে প্রতিনিধিদল রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিময় করে দূষণের জন্য দায়ী শিল্পকারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নদীর পানি দ্রুত ব্যবহারযোগ্য করার দাবি জানায়।
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম জানান, অভিযুক্ত কারখানাগুলো বগুড়া জেলায় হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে ফুলজোর নদীকে দূষণমুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।