মোবাইল মেকার থেকে কোটি টাকার মালিক
মোঃ মুনিরুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
সম্পদের বিস্তার ও অর্থের উৎস ঘিরে প্রশ্ন, দুদকের হস্তক্ষেপ দাবি আরও জোরালো। প্রস্তাবিত নয়ন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার–এর উদ্যোক্তাকে ঘিরে ধারাবাহিক অনুসন্ধানে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। এর আগে হাসপাতাল প্রকল্প ও একাধিক আলিশান স্থাপনার তথ্য প্রকাশের পর এবার সম্পদের বিস্তার, অবস্থান এবং অর্থের উৎস নিয়ে নতুন করে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোঃ আনসারুল ইসলাম (নয়ন) ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোঃ মোমিন ওরফে কাজল (পিতা: মোঃ আতাউর রহমান), গ্রাম: বীরেশ্বরপুর, পোস্ট: সুরানপুর, ২নং গোহালবাড়ি ইউনিয়ন, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই ঠিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক স্থাপনা ও সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর তথ্য অনুযায়ী—
১) পিরোজপুর সোনামসজিদ বিজিবি ক্যাম্পের পাশেই রয়েছে নয়ন গেস্টহাউজ,
২) ভোলাহাট ব্র্যাক অফিসের সামনে নির্মিত একটি পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন,
৩) ভোলাহাট এলাকায় নয়ন হাসপাতাল নামে একটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
এছাড়াও ভোলাহাট উপজেলার বিলভাতিয়া বিলে প্রায় ২০ বিঘা জমি জবরদখল করে ভোগদখল করা হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব সরকারি/খাস কিংবা বিতর্কিত জমি প্রভাব খাটিয়ে দখলে রাখা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ কৃষক ও ভূমিহীনরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগেও মোঃ আনসারুল ইসলাম (নয়ন) একজন সাধারণ মোবাইল মেকার (মোবাইল মেরামতকারী) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এতো বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বহুতল ভবন, গেস্টহাউজ ও হাসপাতাল প্রকল্পের মালিক বা উদ্যোক্তা হওয়াকে তারা স্বাভাবিক মনে করছেন না। ফলে এসব সম্পদের অর্থের উৎস, বিনিয়োগের বৈধতা, আয়কর পরিশোধ এবং ব্যাংক লেনদেন নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন ও সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত সোনামসজিদ জিরো পয়েন্টে বিজিবি ক্যাম্পের পাশেই গেস্টহাউজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার জোরালো দাবি উঠেছে। সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ভোলাহাট ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন সময়ে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদ ক্রয়ের কোনো দৃশ্যমান সামঞ্জস্য নেই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল নির্মাণ, গেস্টহাউজ পরিচালনা কিংবা জমির মালিকানা সংক্রান্ত কোনো নথিপত্রও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, পুরো বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ভূমি প্রশাসন, আয়কর বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। তাদের মতে, তদন্তে সম্পদ বৈধ প্রমাণিত হলে বিভ্রান্তির অবসান হবে, আর অনিয়ম বা অবৈধতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সব মিলিয়ে, একসময় সাধারণ পেশায় যুক্ত একজন ব্যক্তির হঠাৎ করে বহুকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার ঘটনাটি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।