সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরীর হাতে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়
২ অক্টোবর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ ইসলামের ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন। এই দিনে মহান মুসলিম সেনাপতি ও শাসক সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি যিনি ইতিহাসে সালাহউদ্দীন আইয়ূবী নামে প্রসিদ্ধ, দীর্ঘ সংগ্রামের পর পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস তথা জেরুজালেম পুনরায় মুসলিম শাসনের অধীনে আনেন।
তিনি শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতি ছিলেন না; মুসলিম ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে তিনি দ্বীন, ন্যায়বিচার, সাহস, সংযম ও উম্মাহর ঐক্যের জন্য স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস হলো ইসলামের অন্যতম পবিত্র ভূমি। এখানেই রয়েছে পবিত্র মসজিদ আল-আকসা, যে মসজিদকে মহান আল্লাহ ﷻ পবিত্র আল-কুরআনে বরকতময় বলে উল্লেখ করেছেন।
মহান আল্লাহ ﷻ ইরশাদ করেন—
> سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ
“পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিবেলা মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গিয়েছেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি।”
— সূরা আল-ইসরা ১৭:১
মুসলিমদের প্রথম কিবলা, নবী-রাসূল আলাইহি ওয়াসাল্লামদের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি এবং পবিত্র মিরাজ শরীফের সঙ্গে সম্পর্কিত এই পবিত্র স্থান মুসলিম হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
পবিত্র জেরুজালেম পুনরায় বিজয়ের আগে ১১৮৭ সালের ৪ জুলাই হিত্তীনের যুদ্ধে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই বিজয় ছিল পরবর্তী পবিত্র জেরুজালেম অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর একের পর এক মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ও মুসলিমদের নগর মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। শেষ পর্যন্ত সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি-এর বাহিনী পবিত্র জেরুজালেম অবরোধ করে। কয়েকদিনের অবরোধ ও দখলদার ক্রুসেডারদের সাথে আলোচনার পর জেরুজালেমের দখলদাররা আত্মসমর্পণে সম্মত হয়।
২ অক্টোবর ১১৮৭, খ্রিস্টীয় হিসাবে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি পবিত্র জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। এই ঘটনাটি বিশেষভাবে স্মরণীয় কারণ ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় পবিত্র জেরুজালেম বিজয়ের প্রায় ৮৮ বছর পর নগরী পুনরায় মুসলিমদের অধীনে আসে।
কিন্তু সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি-এর বিজয়ের অন্যতম আলোচিত দিক ছিল—তিনি ১০৯৯ সালের গণহ*ত্যার পুনরাবৃত্তি করেননি। দখলদার আত্মসমর্পণকারী জনগণের সঙ্গে চুক্তি ও মুক্তিপণের ব্যবস্থা করা হয় এবং বহু মানুষকে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁর এই আচরণ মধ্যযুগীয় যুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
১৫ জুলাই ১০৯৯ ক্রুসেডাররা পবিত্র জেরুজালেম দখল করেছিলো এবং এরপর মুসলিম ও ইহুদি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক হ*ত্যাকাণ্ড চালায়। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় প্রায় ২০,০০০ নিহতের কথা বলা হয়েছে। অন্য কিছু সূত্রে ৪০,০০০-এর বেশি নিহতের হিসাব পাওয়া যায়। মধ্যযুগীয় ক্রুসেডারদের নিজেদের বর্ণনাতেও ব্যাপক হত্যার উল্লেখ আছে। যেমন, লাতিন বর্ণনায় অনেক বেশি সংখ্যা এসেছে; যেমন Fulcher of Chartres টেম্পল এলাকার জন্য ১০,০০০ নিহতের কথা লিখেছেন এবং নারী ও শিশুরাও নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ৪০,০০০–৭০,০০০-এর মতো বড় সংখ্যাও কিছু পরবর্তী/জনপ্রিয় ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়।
পবিত্র জেরুজালেম মুসলিমদের হাতে আসার পর মসজিদুল আকসা ও সংশ্লিষ্ট পবিত্র স্থানগুলোকে পুনরায় ইসলামী ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। দীর্ঘ সময় পর পবিত্র মসজিদুল আকসায় আবার মুসলিম ইবাদতের পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, জুমার নামাজ আদায় এবং খুতবা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম কর্তৃত্বের প্রত্যাবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়।
একজন মুসলিমের জন্য এই ইতিহাস কেবল “আমরা জিতলাম, তারা হারল”—এমন গল্প নয়। ইসলাম বিজয়ী অবস্থাতেও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়।
মহান আল্লাহ ﷻ ইরশাদ করেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার করা থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
—সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮
এই আয়াতের আলোকে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরও উচিত—নিজেদের পূর্বসূরিদের সম্মান করতে গিয়ে ইতিহাসের দুর্বলতা গোপন না করা এবং অন্য পক্ষের অপরাধ বর্ণনা করতে গিয়ে প্রমাণহীন সংখ্যা যোগ না করা।
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী আল ক্বাদেরী রহমতুল্লাহ আলাইহি-এর মহত্ত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবনের সঙ্গে যেসব গুণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়—ইখলাস, সবর, সাহস, তাওয়াক্কুল, ন্যায়বিচার, দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং দ্বীনের জন্য আত্মত্যাগ। তিনি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে রাষ্ট্র ও যুদ্ধনীতির ওপর প্রাধান্য দেননি—এমন বহু ঘটনা মুসলিম ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল কেবল কোনো ভূখণ্ডের মালিক হওয়া নয়; বরং মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর বিভক্তি দূর করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসের ইতিহাস আমাদের শুধু অতীতের একটি যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয় না। এটি আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
১. ঐক্য: বিভক্ত মুসলিম শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার গুরুত্ব।
২. ইখলাস: দ্বীনের কাজ ব্যক্তিগত খ্যাতি ও ক্ষমতার জন্য নয়—মহান আল্লাহ ﷻ’র সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত।
৩. সবর ও দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা: পবিত্র জেরুজালেম পুনরুদ্ধার একদিনে হয়নি; দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রস্তুতি ও ধৈর্যের ফল ছিল।
৪. বিজয়ের সময়ও ন্যায়বিচার: ক্ষমতা হাতে আসার পর প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
৫. বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতি ভালোবাসা: পবিত্র মসজিদুল আকসা মুসলিম ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান—এটি জানা, সম্মান করা এবং এর ইতিহাস সংরক্ষণ করা মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।