পাকিস্তানে ভয়াবহ হামলায় ১১ সেনা নিহত: টিটিপি ও ভারত-সমর্থিত সংগঠনের যোগসাজশের অভিযোগ
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ওরাকজাই জেলায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় দেশটির সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল, মেজরসহ ১১ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) রাতের এই হামলার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং একটি নতুন সংগঠন ‘ফিতনা আল খারেজ’, যাদের ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সমর্থন পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে ইসলামাবাদ।
বুধবার (৮ অক্টোবর) দেশটির সামরিক জনসংযোগ দপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, অভিযানে অংশ নিয়ে ফেরার পথে সেনাদের বহরে দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা হামলা চালানো হয়। বোমার বিস্ফোরণে বহরের একটি গাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। ওই গাড়িতেই ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, মেজরসহ ১১ সেনা সদস্য।
ঘটনার পর সেনাবাহিনী দ্রুত আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে এবং পালিয়ে যাওয়া হামলাকারীদের ধরতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। যদিও হামলাকারীরা পাহাড়ি অঞ্চল ব্যবহার করে পালিয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইএসপিআর জানিয়েছে, “যে রক্ত শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, তা বৃথা যাবে না। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই আরও জোরদার করা হবে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নতুন উত্থানকে নির্দেশ করে। গত কয়েক মাসে আফগান সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর ওপর হামলা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, ওরাকজাই জেলা ও আশপাশের অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই টিটিপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে এই গোষ্ঠী আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
টিটিপি ও ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
পাকিস্তানি সামরিক সূত্র দাবি করছে, হামলায় টিটিপির পাশাপাশি ভারত-সমর্থিত নতুন সংগঠন ‘ফিতনা আল খারেজ’ও জড়িত। ইসলামাবাদের দাবি, এই গোষ্ঠী আফগান সীমান্তের ভেতর থেকে পরিচালিত হয় এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আর্থিক সহায়তা পায়।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে প্রায় প্রতিদিনই সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি এবং জনগণের আতঙ্ক দুই-ই বাড়ছে।
এনডিটিভি ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার এবং সেনা নেতৃত্ব এখন সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে নতুন করে ভাবছে। কারণ টিটিপি–র বিরুদ্ধে গৃহীত কৌশলগুলো কার্যকর হচ্ছে না বলে সমালোচকরা মনে করছেন।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এই হামলার পর পাকিস্তান–ভারত সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসলামাবাদ ইতিমধ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উত্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, আফগান সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ে পাকিস্তান তালেবান সরকারের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
উপসংহার
ওরাকজাইয়ের হামলাটি শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। একদিকে টিটিপি ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান, অন্যদিকে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা — এই দুই মিলে অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলেছে, তারা “সন্ত্রাসবাদ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াই আরও দীর্ঘ ও জটিল আকার নিতে যাচ্ছে।