October 3, 2026, 7:10 pm
শিরোনাম :
ভোলার নয় কূপে দৈনিক ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ তারাগঞ্জে ডালিয়া সেচ প্রকল্পের মেঠোপথে ৪০০ তালবীজ রোপণ: ছায়াশূন্য মাঠে স্বস্তির উদ্যোগ হাতিয়ায় ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রেস-ক্লাব ট্রাস্টের ঢাকা দক্ষিণাঞ্চলের (সাবেক ফরিদপুর) পাঁচ জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত ভোলা পূর্ব ইলিশা জংশন বাজার মাঠে জমজমাট মিনি ফুটবল টুর্নামেন্ট ২ অক্টোবর ২০২৬ বাদ জুম্মা শহীদ হাদী চত্বর শাহবাগ ঢাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি মোঃ সিমান্ত তালুকদার জিন্দারপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী সাজ্জাদুল হকের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ হাতিয়ায় ‘পপি ফ্রিজ শো-রুম’-এর শুভ উদ্বোধন গোপালগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ‘ফ্যাব্রিক লাইব্রেরি’র যাত্রা শুরু, দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত জলঢাকায় ছাগল-ভেড়ার পিপিআর টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন

ভোলার নয় কূপে দৈনিক ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ

বিভাগীয় প্রদান :ইমন রহমান

ভোলার নয় কূপে দৈনিক ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ

বিভাগীয় প্রদান :ইমন রহমান

দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। একই সময়ে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভরতা ও ব্যয়ও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের বাইরে থাকা ভোলার গ্যাসসম্পদ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। জেলার নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আরও প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থাকার তথ্য রয়েছে।
মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভোলায়
ভোলার গ্যাসের গুরুত্ব স্পষ্ট হয় দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের হিসাবেও। জেলার শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪৩২ থেকে ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। সে হিসাবে দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশ বা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভোলায় রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্য মজুত ও বাস্তবে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস এক বিষয় নয়। নতুন কূপ খনন, উৎপাদন পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য মজুত সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সঞ্চালন অবকাঠামোই বড় বাধা
ভোলায় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকায় এর বড় অংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ কারণে ভোলার গ্যাসকে জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের প্রক্রিয়াও চলছে।

সম্প্রতি ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে ভোলার গ্যাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও সময় প্রয়োজন হবে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ভোলার গ্যাসকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাসের মজুত থাকলেও তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।’
এলএনজি আমদানির চাপ কমানোর সুযোগ
দেশের সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতিও ভোলার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসে।

এলএনজি আমদানি স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করলেও এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাবও রয়েছে। ফলে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাড়ছে উৎপাদনের উদ্যোগ

ভোলায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা নর্থ-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১ কূপ থেকে অতিরিক্ত ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রসেস প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া ভোলায় আরও পাঁচটি নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কূপে অনুসন্ধান সফল হলে ভবিষ্যতে গ্যাস উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বর্তমান উৎপাদন নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উৎপাদন বিবেচনায় নিয়েও সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

বাপেক্স ও রাশিয়ার গ্যাসপ্রমের অনুসন্ধানে ভোলার বিভিন্ন এলাকায় আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে চরফ্যাশনসহ জেলার দক্ষিণাঞ্চলে নতুন অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাসসম্পদের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় শিল্পেও ব্যবহারের সুযোগ
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়াই একমাত্র সম্ভাবনা নয়। স্থানীয়ভাবেও এ গ্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক শিল্প, শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভোলার মেসার্স খান ফ্লাওয়ার মিলসের স্বত্বাধিকারী ও ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খান বলেন, ‘গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হলে ভোলায় শিল্প স্থাপনের আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, সড়ক, নদীবন্দর, যোগাযোগ ও শিল্প অবকাঠামোও একসঙ্গে উন্নত করতে হবে। শুধু গ্যাস থাকলেই বড় শিল্পায়ন সম্ভব নয়।’

ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘ভোলার গ্যাসের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু কত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে, তা দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। গ্যাসটি কোথায় ব্যবহার করলে দেশের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ মূল্য সংযোজন হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। বিদ্যুৎ, সার, শিল্পকারখানা এবং জাতীয় গ্রিড—সবগুলো বিকল্পের ব্যয় ও সুফল তুলনা করে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস নিয়ে বড় বিনিয়োগের আগে প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য মজুত নির্ধারণ করা জরুরি। অনুসন্ধান, কূপ খনন, উৎপাদন পরীক্ষা এবং সময়ের সঙ্গে কূপের চাপ ও উৎপাদন ক্ষমতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এবং বাপেক্সের ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ এগিয়ে চলছে।
শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশের বিষয়ও
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে কোনো একটি খাতকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা না করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় গ্রিডে কতটা গ্যাস যাবে, স্থানীয় শিল্পে কতটা ব্যবহার হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কতটা দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কতটা সক্ষমতা রাখা হবে—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নির্ধারণ করা দরকার।

একই সঙ্গে ভোলার নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন শিল্প ও গ্যাস অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনায় ভোলার গুরুত্ব

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, এলএনজি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, ভোলায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে, যা দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ। এর পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধানে আরও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে অনুসন্ধান, উৎপাদন, প্রসেসিং, সঞ্চালন, শিল্পায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। ভোলার গ্যাসকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হোক কিংবা স্থানীয় শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হোক—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন মূল বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা