August 18, 2026, 1:04 am
শিরোনাম :
নীলফামারীতে ২ হাজার বৃক্ষরোপণ করল ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন টুঙ্গিপাড়ায় বাশুড়িয়া সেনেরচর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন বেহাল: আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা, দ্রুত সংস্কারের দাবি ডিমলায় তিস্তা সেচ ক্যানেলে ডুবে খালা-ভাগ্নির মর্মান্তিক মৃত্যু নাটোরের সিংড়ায় মহাসমারোহে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গোপালগঞ্জ টু ঢাকা ট্রেন সার্ভিসের সময় পরিবর্তনের দাবি নীলফামারীতে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদ্বোধন, বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও মাছের পোনা অবমুক্তকরণ গোপালগঞ্জে জাতীয় মৎস্য শুভ উদ্বোধন আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ চিরিরবন্দরে জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ উপলক্ষে পোনা মাছ অবমুক্ত, র‍্যালি ও আলোচনা সভা পাবনায় মহা সমারোহে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) ও জশনে জুলুশ মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেন পীরে ত্বরিকত হযরত নুর মুহাম্মাদ আজাদ খান চিশতী আল-মুজাদ্দেদী

​গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী: ডিমলায় আনসার-ভিডিপির ‘সুরক্ষা মডেলে’ ইতিহাস গড়া ১৩তম জাতীয় নির্বাচন

আব্দুল হালিম জেলা প্রতিনিধি নিলফামারী

​গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী: ডিমলায় আনসার-ভিডিপির ‘সুরক্ষা মডেলে’ ইতিহাস গড়া ১৩তম জাতীয় নির্বাচন

​নিজস্ব প্রতিবেদন, আব্দুল হালিম নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলাজুড়ে বইছিল এক অন্যরকম চাঞ্চল্য। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চারদিকে উৎসবের আমেজ। গত ১১ই ফেব্রুয়ারি ডিমলা উপজেলা মাঠ যখন প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিং অফিসার এবং ১,০৯২ জন সুপ্রশিক্ষিত আনসার-ভিডিপি সদস্যের পদচারণায় মুখরিত, তখন আকাশ-বাতাস সাক্ষ্য দিচ্ছিল এক নতুন ইতিহাসের।
​প্রস্তুতির বিশাল কর্মযজ্ঞ ও ডিজিটাল বিপ্লব
​ডিমলা উপজেলা মাঠের চিত্রটি ছিল ব্যস্ততার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নীলফামারী জেলা কমান্ড্যান্ট জনাব মাজারুল ইসলাম ভূঁইয়া স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন—”জনগণকে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতেই হবে।” সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা জনাব মো: ফারুক হোসাইনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে শুরু হয় সদস্যদের কেন্দ্রে প্রেরণ।
​নির্বাচন ব্যবস্থার এক বিশেষ মাইলফলক ছিল ‘সুরক্ষা লিংক’ এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। প্রযুক্তির এই উদ্ভাবনী ব্যবহারে মুহূর্তের মধ্যে উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রের তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধতন কর্মকর্তারা এই লিংকের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডের খবর পাচ্ছিলেন, যা পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

​মালামাল গ্রহণ ও দুর্গম
যাত্রা
​উপজেলা নির্বাহী অফিসের নিচতলায় কৃষি অফিসার মীর হাসান আল বান্না ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অত্যন্ত সততার সাথে নির্বাচনী সরঞ্জামাদি বুঝে নেন আনসার সদস্যরা। সিসি (কমান্ড সার্টিফিকেট), সিল, ব্যালট বক্স, ব্যানার, অমোচনীয় কালি এবং যাবতীয় স্টেশনারি মালামাল বুঝে নিয়ে আমাদের পুলিশ সহ আনসার ভিডিপির১৩ জনের চৌকস দল রওনা হয় ডিমলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র— উত্তর ঝুনাগাছ চাপানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কেন্দ্র নং-১৩৫) অভিমুখে।
​রাতভর পাহারায় একনিষ্ঠ সেবা
​কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করে আমরা নিরাপত্তা কৌশল সাজাই। বিশেষ করে নারী সদস্যদের মর্যাদার কথা মাথায় রেখে তাদের জন্য আলাদা বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। তবে আমরা পুরুষ সদস্যরা ৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর তিনজনের একটি গ্রুপ করে সারারাত কেন্দ্রটি সুরক্ষিত রাখি। নিস্তব্ধ রাতে আমাদের প্রতিটি পদধ্বনি যেন ভোটারদের মনে নিরাপত্তা ও আস্থার বাণী দিচ্ছিল।

​১২ই ফেব্রুয়ারি: ভোটের উৎসব ও মানবিকতার গল্প
​ভোর হতেই হালকা কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভেসে আসে পাখির কলকাকলি। সেই সাথে শুরু হয় ভোটারদের আনাগোনা। ১৭ বছর পর ভোট দিতে পেরে সত্তরোর্ধ্ব জব্বার চাচা আবেগী কণ্ঠে বলেন, “বাবা, ফজরের নামাজ শেষ করেই পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে আসলাম। আল্লাহ যেন দেশটারে ভালো রাখে।” সকাল ৭:৩০ মিনিটে প্রিজাইডিং অফিসার জনাব আবু জাহিদ মো: ফাহামিদুল করিমের নির্দেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সূর্যের মিষ্টি আলো বাড়ার সাথে সাথে কেন্দ্রে নারী ও পুরুষ ভোটারদের দীর্ঘ লাইন যেন এক রঙিন উৎসবে রূপ নেয়।
​১৩ জনের সেই ‘ড্রিম টিম’-এর বীরত্বগাঁথা
​আমাদের এই ছোট টিমের প্রতিটি সদস্য ছিলেন এক একজন নির্ভীক যোদ্ধা:
​মো: গোলাম রব্বানী ও শাহিনুর ইসলাম: সেকশন কমান্ডার ও সহকারী সেকশন কমান্ডার হিসেবে তারা শটগান হাতে মেইন গেটে পাহাড়ের মতো অটল দাঁড়িয়ে ছিলেন। অসুস্থ ভোটারদের হুইলচেয়ার ঠেলে দেওয়া থেকে শুরু করে যানজট নিরসন—সবই ছিল তাদের কাজের অংশ।
​মনিরুল ইসলাম: প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে তিনি ছায়ার মতো অফিসারের পাশে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
​সোহেল রানা, কামরুজ্জামান (টিটুল) ও মোস্তফা আলী: তারা ১, ২ ও ৩ নম্বর বুথের সারিতে দাঁড়িয়ে ফাইল সোজা রাখা এবং ভোটারদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার কঠিন কাজটি সুনিপুণভাবে করেছেন। তাদের সজাগ দৃষ্টিতে কোনো বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।
​সুজন মোহন্ত রায় ও পলাশ চন্দ্র রায়: তাদের মার্জিত ব্যবহার ও শিক্ষিত রুচিবোধ ভোটারদের মুগ্ধ করেছে। তারা ভোটারদের চিরকুট যাচাই করে দ্রুত বুথে প্রবেশের ব্যবস্থা করেছেন।
​সোহাগী, সোনালী, পারুল ও মনসুরা: এই সাহসী নারী সদস্যরা ছিলেন সেদিনের প্রকৃত নায়ক। তিতপাড়ার সোহাগী আক্তার ও সোনালী আক্তার যেন মা-বোনদের আপন সন্তান হয়ে উঠেছিলেন। লিলিমা খাতুন নামের এক বৃদ্ধাকে কোলে তুলে বুথে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলেন।

​ক্লান্তিহীন দুপুর ও সফল সমাপ্তি
​দুপুরের তীব্র গরমে তৃষ্ণা আর ক্ষুধায় যখন শরীর ক্লান্ত, তখন আমার পকেটে থাকা সামান্য খেজুর আর পানিই ছিল অফুরন্ত শক্তির উৎস।
প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বুক পকেটে থাকা সিসি ক্যামেরা এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সার্বক্ষণিক নজরদারি আমাদের কাজে আরও গতি এনে দেয়।
​বেলা ১১:৩০ মিনিটেই ১,০১৫টি (প্রায় ২৯%) ভোট কাস্ট হয়। বিকেল ৪:৩০ মিনিটে যখন ভোটগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়, তখন বাইরের শত শত মানুষের মাঝে ছিল চূড়ান্ত ফলাফলের টানটান উত্তেজনা। সন্ধ্যার আগে যখন ফলাফল ঘোষণা করা হলো, তখন এলাকার মানুষের মুখে ছিল আমাদের প্রতি অজস্র আশীর্বাদ।
আমি আব্দুল হালিম আনসার ভিডিপি সদস্য হিসেবে
​সেন্টার তদারকি: আমি ভোটকেন্দ্রের ভেতর ও বাইরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করিএবং আইন-শৃঙ্খলার নিছিদ্র বেষ্টনী নিশ্চিত করার চেস্টা করি।

​শৃঙ্খলার কারিগর: বিশাল জনসমুদ্রকে আদবের সহিত সোজা লাইনে দাঁড় করানো এবং ভোটারদের সঠিক বুথে প্রবেশের পথ সুগম করতে আমি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি।

​মানবিক সেবা: দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোট দিতে আসা বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের ভোটদান প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে সরাসরি সহায়তা করি।

​সমন্বয়কারী: কেন্দ্রের ভেতরের ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং বাইরে অবস্থানরত লোকজনকে সরিয়ে দিয়ে একটি কোলাহলমুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ ধরে রাখতে এবং তথ্য আদান প্রদানে আমি সফল হন।

​ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত ফলাফল একনজরে
​প্রিজাইডিং অফিসার আবু জাহিদ মো: ফাহামিদুল করিম স্বাক্ষরিত ‘ফরম-১৬’ অনুযায়ী কেন্দ্রটির প্রাপ্ত ফলাফল নিচে দেওয়া হলো:
​ভোটকেন্দ্রের নাম: উত্তর ঝুনাগাছ চাপানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
​মোট ভোটার সংখ্যা: ৩৩,৩০ জন।
​মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা: ১,৯৫৩টি।
​বাতিলকৃত (অবৈধ) ভোটের সংখ্যা: ৬৬টি।
​সর্বমোট সংগৃহীত ভোট (বৈধ+অবৈধ): ২,০১৯টি।
​প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট:
১. মাওলানা মো: মনজুরুল ইসলাম (খেজুর গাছ): ৩৪৫টি।
২. মো: আব্দুস সাত্তার (দাঁড়িপাল্লা): ১,৫৩৯টি (সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত)।
৩. মো: মখদুম আজম মাশরাফী (বাইসাইকেল): ৩৯টি।
৪. মো: তছসিল উদ্দিন (লাঙ্গল): ২১টি।
৫.অন্যান্য প্রার্থী: বাকি প্রার্থীরা একক সংখ্যায় ভোট লাভ করেছেন।

আমার ​অনুভূতি—
​আমি আব্দুল হালিম, একজন পেশাদার সাংবাদিক এবং একজন গর্বিত আনসার-ভিডিপি সদস্য। সেদিন আমি বুঝেছি, অস্ত্রধারী বা অস্ত্রবিহীন—দেশসেবাই বড় কথা। ডিমলা উপজেলা প্রশিক্ষিকা মরিয়ম বানু স্যার যখন ফোনে বারবার আমাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল আমরা একটি পরিবারের অংশ। দিনশেষে যখন ভোট বক্স নিয়ে নিরাপদে ডিমলা উপজেলা মাঠে পৌঁছালাম এবং স্যারদের কাছ থেকে ধন্যবাদ পেলাম, তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।
​ডিমলার এই ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, জনগণের বিশ্বাস, আধুনিক প্রযুক্তি আর আনসার-ভিডিপির সততা থাকলে যেকোনো অসাধ্য সাধন সম্ভব। এই স্মৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা