ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ও ইজরায়েলের চুক্তি:
নেগোশিয়েশন শুরু হওয়ার আগেই ইরান প্রমাণ করেছে, তারা যোগ দিতে ডেস্পারেশন থেকে না।
১১ এপ্রিল ২০২৬
রেজাউল করিম রিয়াদ
প্রথমত, সীজফায়ারটা ইরান চায়নি।
প্রথমে অন্যান্য মিডিয়া এবং সাংবাদিকরা দাবি করলেও পরবর্তীতে নিউ ইয়র্ক টাইমসও জানিয়েছে, ইরানিরা সীজফায়ারে আগ্রহী ছিল না। ট্রাম্পই পাকিস্তানকে অনুরোধ করে ইরানকে রাজি করিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নিউক্লিয়ার থ্রেটের পরেও ইরানিরা এক কথায় সীজফায়ারে রাজি হয়নি। তারা শর্ত দিয়েছে, ট্রাম্প যদি প্রকাশ্যে ইরানের ১০ পয়েন্ট দাবির ভিত্তিতে আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলেই কেবল তারা আলোচনায় বসতে রাজি হবে। এবং শেষপর্যন্ত ট্রাম্প সেটাই করতে বাধ্য হয়েছে।
তৃতীয়ত, কার টুইটের ভাষা কী হবে, সেটাও ইরান এবং আমেরিকা দর কষাকষি করেই ঠিক করেছে। এবং এক্ষেত্রেও ইরানিরা অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে।
তারা জানত, ইসরায়েল এই সীজফায়ার ভাঙার চেষ্টা করবে। এবং সেটা তারা করবে লেবাননে বম্বিং চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এবং সেজন্যই তারা শাহবাজ শরিফকে দিয়ে স্পেসিফিক্যালি লেবাননের নাম উল্লেখ করিয়ে টুইট করিয়েছিল।
ইসরায়েল অবশ্য সেটা প্রথমে মানেনি। প্রথমদিন ভয়াবহ হামলা কন্টিনিউ করেছে। কিন্তু ইরান আগে থেকেই লেবাননের নাম সরাসরি টুইটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করাতে পেরেছিল বলেই পরবর্তীতে তারা জোরালো অবস্থান গ্রহণ করতে পেরেছিল।
গতকাল সারাদিন ইরান অনড় অবস্থানে ছিল। আমেরিকান প্রতিনিধি দল আগেই পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু ইরান তখনও যাত্রাই শুরু করেনি। তাদের দাবি ছিল, লেবাননে সীজফায়ার না হলে আর তাদের কিছু পরিমাণ অর্থ আনফ্রিজ না করা হলে তারা পাকিস্তানে আলোচনায় যাবে না।
এবং শেষপর্যন্ত আমেরিকা সেই দাবিও মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের চাপে ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ করতে এবং লেবাননের সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে। এবং ইরানি মিডিয়া দাবি করছে, ৬ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড আনফ্রিজ করতেও আমেরিকা রাজি হয়েছে।
ইসরায়েলের সাথে আরবদের, বিশেষ করে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন পিএলও'র নেগোশিয়েশনগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেখেছি, আরবরা বারবার কী পরিমাণ অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে, আর আমেরিকা-ইসরায়েল কীভাবে বারবার তাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে।
১৯৬৭ সালের জাতিসংঘের রেজুলেশনে আমেরিকা-ইসরায়েল ইংরেজি ড্রাফটে কৌশলে একটা "The" বাদ দিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেটার ভাষাটাকেই দুর্বল করে ফেলেছিল। আজও ইসরায়েল পশ্চিম তীরে তাদের দখলদারিত্বের জাস্টিফিকেশন হিসেবে সেই রেজুলেশনের অজুহাত দেখায়।
আর অসলোতে তো পিএলও'র প্রতিনিধিদের কোনো প্রস্তুতি এবং বাস্তবতা সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণাই ছিল না। আমেরিকা-ইসরায়েল জাস্ট নিজেদের ইচ্ছামতো ড্রাফট তৈরি করেছে।
(অথচ ইরানিরা দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে নেগোশিয়েশন করতে হয়। কীভাবে নিজেদের অনড় অবস্থান ধরে রাখতে হয়। কীভাবে আলোচনা শুরুর আগেই স্ট্রং অবস্থান প্রকাশ করতে হয়। কীভাবে টুইটের ভাষা পর্যন্ত ঠিক করে দিতে হয়। আমেরিকাকেই বরং এখানে ইারেনিদের যোগ্যতার কাছে অসহায় মনে হচ্ছে।)
যে ৮৬ জনের টিম নিয়ে ইরানি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে গিয়েছে, তাদের তালিকা দেখলেও ইরানিদের প্রস্তুতি এবং সিরিয়াসনেস বোঝা যায়। সেই প্রতিনিধিদের তালিকায় স্পীকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যডভাইজার তো আছেই। আরও আছে কিছু বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, এমনকি আছে সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরও।
নেগোশিয়েশন শেষে আমেরিকা আবারও সেটা ভঙ্গ করবে কি না, সেই আশঙ্কা তো আছেই। কিন্তু তারপরেও সেই নেগোশিয়েশনেও তারা কোনো দিক থেকে ছাড় দিতে রাজি না। কোনো দুর্বল চুক্তি করে আসতে রাজি না, যার খেসারত পরবর্তীতে দিতে হতে পারে। প্রতিটা বিভাগের বেস্ট লোকগুলোকে তারা নিয়েছে যেন কোনো ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে তাদেরকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে ঠকানো না যায়।
ইরানের কাছ থেকে আসলেই মুসলিম বিশ্বের অনেক অনেক অনেক কিছু শেখার আছে।